ডাঃ শশীর ডাকে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, ঘুটঘুটে অন্ধকার। হাতে শুধু একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার। ফিসফিস করে বললেন, ‘চোখ খুলো না। আমার হাত ধরে এগিয়ে এসো।’ হাত ধরে ঘর থেকে বারান্দায় এনে বললেন, ‘এবার চোখ খোলো।’ দেখলাম, একটা নরম আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশটা। মাটির ওপর আসন করে রাখা শ্রীকৃষ্ণের একটা মূর্তি। তার সামনে পিতলের প্রদীপ জ্বলছে। আর নারকেলের দুটো মালায় তেল ঢেলে সলতে-তে ধরানো হয়েছে আগুন। চারপাশে পিতলের কয়েকটা পাত্রে কোনওটায় রাখা চাল, কোনওটায় গোটা লাউ, শশা, এঁচোড়। আগুনের শিখায় পিতলের বাসনগুলো চকচক করছে। পাশে ছড়ানো কয়েকটা সোনার গয়না, মুদ্রা। আর আসনে ছড়ানো কিছু হলুদ ফুল। ওঁরা বলেন, কাণ্যা। দেবতাকে এই যে নিবেদন, তা হল কানি। আর ওই ফুলকে ওঁরা বলেন, কানিকাণ্যা। দিনটা ছিল বর্ষবরণের। আমাদের যেমন নববর্ষ, কেরালার মানুষজন পালন করেন বিশু। বছরের ওই প্রথম দিনটায় ওঁরা চোখ খুলে দেখেন এই পবিত্র কানি। তারপর সারাদিন নানা অনুষ্ঠান, খাওয়াদাওয়া। বিশুর দিনটায় আমার ঠিকানা ছিল, কালিকট থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কোয়েলান্ডির একটা প্রত্যন্ত গ্রামে। ডাঃ শশীর বাড়ি সেখানেই। গ্রামের নাম কাভুভাট্টাম। স্ত্রী মিনি আর আট বছরের ছেলে উন্নিকুট্টানকে নিয়ে সবুজের কোলে শশীবাবুর সংসার। ওঁর বাড়ির বারান্দাটায় এসে বসলেই প্রকৃতি এসে হাত ধরবে আপনার। সামনে দিগন্ত অবধি বিস্তৃত নারকেল গাছের জঙ্গল। নিবিড় নিস্তব্ধতা ভেঙে মাঝে মাঝে মাটিতে নারকেল আছড়ে পড়ার শব্দ শোনা যায়। বাড়ি ঢোকার রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এভাবেই পড়ে থাকে প্রচুর নারকেল। আর আছে পাখি। নানারকম। চড়াই, ঘুঘু, বক, ফিঙে, মাছরাঙা, পানকৌড়ি কত কী। দিনভর কতরকম ডাক তাদের। সন্ধে নামলে নারকেল জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন ওই নিস্তব্ধতা, পাখির ডাক বদলে গিয়ে হয়ে যায় ঝিঝির একঘেয়ে গান। ডাঃ শশী থাকেন এদের নিয়েই। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ। দীর্ঘদিন দেশে, বিদেশে চিকিৎসা করে ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামে। ইচ্ছে একটাই, প্রকৃতির মধ্যে থাকবেন। জঙ্গল থেকে নিজে হাতে তুলে আনবেন ভেষজ গাছপালা, শিকড়বাকড়। নিজে মালয়ালমভাষী হলেও পড়ে ফেলেছেন বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুবাদ সাহিত্যে। আর জীবনের ধ্রুবতারা মেনেছেন আরোগ্য নিকেতনের জীবন মশাইকে। তারাশঙ্করের অমর সৃষ্টি কবিরাজ জীবন মশাই যেমন আর্ত, পীড়িত মানুষের সেবায় জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন, ডাঃ শশী নিজেকে দেখতে চান সেভাবেই। ডাঃ শশীর কথায়, ‘কিছুটা দূরে কালিকট শহরে থাকলেই হয়ত অনেক প্রাচুর্যে থাকতে পারতাম আমরা। আধুনিক জীবনের সুবিধাগুলোও অনেকটা বেশি পেতাম। কিন্তু আমি একটা গ্রাম্য জীবনে ফিরতে চেয়েছিলাম, প্রকৃতির মাঝে ফিরতে চেয়েছিলাম।’ সত্যি, এই জীবনটাই যাপন করেন ডাঃ শশী আর তাঁর পরিবার। গরমে তেষ্টা পেলে জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখেন জবার পাপড়ি। ফুটিয়ে ছেঁকে নেন। তারপর মধু মিশিয়ে সেই জল খেলেই শরীর ঠান্ডা। ডিপ ফ্রিজে রেখে একটু বেশি ঠান্ডা করতে পারলে আরও ভাল। বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে নারকেল কুড়িয়ে আর বাগান থেকে সবজি, কারিপাতা তুলেই হয়ে যাচ্ছে একের পর এক রান্না। কোনওদিন আপাম, কোনওদিন ইডলি, ধোসা, কোনওদিন পাতরি বা পুটু। পাতরি হল চালের গুঁড়ো আর নারকেল কোরা মেখে তৈরি ছোট ছোট রুটির মতো। তরকারি দিয়ে খেতেই পারেন, চাটনি দিয়েও। আপামের মতো পাতলা নয়। বরং লেট্টির মতো খানিকটা। আর পুটু হল চাল আর নারকেল মিশিয়ে তৈরি স্টিমড কেক। ব্রেকফাস্টে ছোট গ্লাসে আসত ফ্যানেভাতের মতো কিছু একটাও। হ্যাঁ, সেই চালের গুঁড়ো। নারকেল কুরিয়ে চালের সঙ্গে মিশিয়ে ফোটানো হয় নারকেল দুধে। সেটা এক গ্লাস খেয়ে নিলেই ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ দুটোই সারা। ডেজার্ট আইটেমে থাকত গুড় আর কলা মিশিয়ে বিশেষ মেনু। কলা আবার কেরালা স্পেশাল। নাম, নান্দ্রা। অনাড়ম্বর একটা জীবন, গাছপালা, পশুপাখি নিয়েই কাটিয়ে দেওয়া। কিছুটা অন্যরকম পেলাম বিশুর ওই দিনটাতে। সম্বর, এঁচোড়, ওল- নানারকম তরকারি। পাতের পাশের চাটনিও নানারকম। মুগ ডাল ভেজে গুঁড়ো করে তার মধ্যে নারকেল তেল ঢেলে তৈরি হচ্ছে চাটনি। বিটরুট আর পেঁয়াজের কুচো দইয়ে মিশিয়ে ডাঃ শশী তৈরি করলেন একটা বিশেষ রায়তা। আর ছিল পায়েসম। মুগ ডালের সঙ্গে গুড়, নারকেল আর দুধ মিশিয়ে তৈরি হল পায়েস। বেশ অন্যরকম।

কালিকটের ‘অপারেশন সুলাইমানি’-র মাধ্যমে জেলার কালেক্টর নিরন্ন মানুষের জন্য বিনা অর্থে খাওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন গোটা কালিকট জেলায়। সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় রেস্তোরাঁ আর হোটেলের মালিকরা। এরকম আরও কিছু প্রকল্প নিয়ে এখানে চলছে ‘কমপ্যাসোনেট কোঝিকোড়’ (কালিকটের বর্তমান নাম)। এরই মধ্যে একটা ‘ফস্টার কেয়ার’। গরমের ছুটির এই সময়টায় যখন বাচ্চারা বাবা-মার সঙ্গে বেড়াতে যায়, ছুটি কাটায়- তখন অনাথ আশ্রমের শিশুদের কিছু করার থাকে না। কালিকটের উদ্যোগী দম্পতিরা এই সময়টা এরকম অনাথ আশ্রমের শিশুদের রাখতে পারেন তাঁদের কাছে। শশী-মিনিদের এক বন্ধু দম্পতি এরকমই দুটি মেয়েকে এনে রেখেছেন তাঁদের কাছে। ফস্টার কেয়ারে। ডাঃ শশীর বাড়িতে একটা ডিনারে আমন্ত্রণ ছিল ওঁদের। সে রাতে অনেকটা আনন্দ করে গেল ওই দুটো ছোট্ট মেয়ে। মিনি-শশীর ছেলে উন্নিকুট্টানের সঙ্গে বাজি পোড়াল, গান গাইল, হাততালি দিল, হাসল। এই হাসিটুকু দেখার জন্যই এত কিছু। ওদের জন্য সেদিন ওয়েলকাম ড্রিঙ্ক বানিয়েছিল মিনি। অনন্তমূল, সুগার সিরাপে ভিজিয়ে দুধ ঢেলে ফ্রিজে রেখে দিল। ঠান্ডা হবার পর মুখে তুলতেই মনে হল, আরে এ তো আইসক্রিম শেক। ডাঃ শশী বললেন, শরীর ঠান্ডা রাখবে অনন্তমূল।
এভাবেই মূল, ফুল, পাতা, ফল নিয়েই ওঁদের জীবন। আর সমানে চলে একটা অদ্ভুত আনন্দের সন্ধান। কে জানে, এটাই অমৃতের সন্ধান কিনা। জানি না, অমৃতের এই স্বাদ বোঝাতে পারলাম কিনা। এই স্বাদ তো পাওয়া যায় না, অনুভব করা যায়, উপলব্ধি করা যায়। আমাদের শহরে জীবনে শপিং মল আছে, সবুজ নেই। ফুড কোর্ট আছে, প্রকৃতি নেই। ব্যস্ততা আছে, ঈশ্বর নেই। অথচ অমৃতের অনন্ত ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছেন মিনি-শশীরা। কেরালার ছোট্ট একটা গ্রামে। গডস্ ওন কান্ট্রিতে।
অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়